স্বাধীনতা বিভিন্ন রূপ (libeety Diferent Forms)
বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে 'স্বাধীনতা' শব্দটিকে বিচারবিশ্লেষণ করার ফলে নানাধরনের স্বাধীনতার অবস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ রূপগুলি (focus) হল:
বক্তিগত ও জাইয় মাদীগরা:
প্রাচীনকালে গ্রিকরা, বিশেষত এথেন্সবাসীরা স্বাধীনতাকে বাক্তিশত এবং সম্প্রদায়গত-এই দু'ভাগে ভাগ করত। (৪) এথেন্ধবাসীরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (Individual Liberty) বলতে যাক্তিগত সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বাহ্যিক আয়ার-কাচরণের ওপর সর্বপ্রবার নিয়ন্ত্রণহীনতাকে বোঝাত। যা তারা সম্প্রদায়গত স্বাধীনতা বলতে যা বুঝত, বর্তমানে তাকে অনেকে জাতীয় স্বাধীনতা (National Liberty) বলে চিহ্নিত করেন। জাতীয় স্বাধীনতা বলতে বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণহীনতাকে বোঝায়। সি. ডি. বার্নদ (C.D. Burns) জাতীয় স্বাধীনতাকে ভাতির সর্বপ্রকার স্বাভাবিক উন্নতির ভিত্তি বলে বর্ণনা করেছেন।
স্বাভাবিক স্বাধীনতা :
প্রাক্রাজনৈতিক যুগে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে বসবাসকারী মানুষ যথেচ্ছাচরণের যে-অবাধ ক্ষমতা ভোগ করত, তাকে স্বাভাবিক স্বাধীনতা (Natural Liberty) বলে চিহ্নিত করা হয়। এরূপ স্বাধীনতা-তত্বের প্রধান প্রবস্তা ছিলেন রুশো। তাঁর মতে, মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও দে আজ সর্বত্রই শৃঙ্খলাবদ। পরবর্তী সময়ে এরূপ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য নৈরাজ্যবাদীরা রাষ্ট্রব্যবম্পর বিলোপসাধনের তত্ত্ব প্রচার করেন।
সামাজিক স্বাধীনতা :
সমাজের বিবেক কর্তৃক স্বীকৃত এবং সামাজিক বিবি কর্তৃক সংরক্ষিত ও নিয়স্ত্রিং স্বাধীনতাই হল সামাজিক স্বাধীনতা (Social Liberty)। কিন্তু সমাজের বিবেক তথা ন্যায়নীতিবোধ যেহেতু অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট ও আপেক্ষিক, সেহেতু এরূপ স্বাধীনতার ধারণাও অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট ও আপেক্ষিক হাও বাধ্য। তাই আজকের দিনে এরুপ স্বাধীনতাকে কেউই স্বীকৃতি দিতে রাজি নন।
অইগসখেত দ্বামীনতা:
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হল আইনসংগত স্বাধীনতা (Legal Liberty) আইনসংগত স্বাধীনতা বলতে সেই স্বাধীনতাকে বোঝায়, যা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, সংরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এরুপ স্বাধীনতার প্রবক্তাদের মতে, কোনো স্বাধীনতাই নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে না। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে প্রত্যেকের স্বাধীনতার ওপর কিছু-না-কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এরূপ স্বাধীনত প্রকৃতিগতভাবে সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। আইনসংগত স্বাধীনতাকে তিনভাগে ভাগ কর যায়, যথা[a] ব্যক্তিস্বাধীনতা বা পৌর স্বাধীনাতা (Individual Liberty or Civil Liberty) b) রাজনৈতিক স্বাধীনতা (Political Liberty) এবং (c) অর্থনৈতিক স্বাধীনতা (Economic Liberty)
(a) ব্যক্তিস্বাধীনতা বা পৌর স্বাধীনতা বলতে সেইসব অধিকার ভোগ করাকে বোঝায়, যার দ্বারা মানুষ তার ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করতে সক্ষম হয়। এইসব স্বাধীনতার মধ্যে চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংথে বা সমিতি গঠন করার স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, পরিবার গঠনের স্বাধীনতা, চুক্তি সম্পাদনের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এইসব স্বাধীনতা রাষ্ট্র কর্তৃব যথাযথভাবে স্বীকৃত ও সংরক্ষিত না হলে ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত হবে।
b) রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকার গঠনে অংশগ্রহণ এবং সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারকে বোঝায়। নির্বাচিত হওয়ার অধিকার, নির্বাচন করার অধিকার, নিরপেক্ষভাবে সরকরি কাজকর্মের সমালোচনা করার অধিকার প্রভৃতি রাজনৈতিক স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। এরূপ স্বাধীনতার স্বীকৃতি ছাড়া গণতন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য বলে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রবক্তারা মনে করেন।
(c) অভাব-অনটন ও দারিদ্রোর হাত থেকে মুক্তিলাভকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলে চিহ্নিত করা হয়। যোগাতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মে নিযুক্ত হওয়ার অধিকার, বেকার ও বার্ধক্যে ভাতা পাওয়ার অধিকার বুণে ও অঞ্চম অবস্থায় রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিপালিত হওয়ার অধিকার, উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকা প্রভৃতি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। ল্যাস্কি, বার্কার প্রমুখ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং মার্কসবাদীরা মনে করেন যে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে মানুষের কাছে অন্যান্য স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। বার্কারের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরাধীন শ্রমিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কথনোই স্বাধীন হয়ে পারে না।
স্বাধীনতার রক্ষাকবচ (Safeguards of Liberty)
**স্বাধীণতার রক্ষাকবচের প্রয়োজণীয়তা:
সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা হল গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার তিনট প্রধান স্তম্ভ। এগুলিকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র কখনোই বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করতে পারে না। এই তিনটি মহান আদশেী মধ্যে স্বাধীনতার গুরুত্ব অপর দুটি অপেক্ষা কোনো অংশেই কম নয়। কিন্তু সমাজবদ্ধ মানুষ কখনোই অবা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। কারণ, অবাধ ও সীমাহীন স্বাধীনতার দাবি সমাজের মধ্যে বিশ্বব্ঙ্খলা সৃষ্টি করে। 'তাই সাধারণভাবে এ কথা মনে করা হয় যে, স্বাধীনতার প্রকৃতির মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের অস্তিত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র আইনো সাহায্যে মানুষের অবাধ স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ ক'রে সমাজের কল্যাণ সাধনে উদ্যোগী হয়। এই স্বাধীনতা ছল মানুষের বাক্তিত্বের বিকাশ কখনোই সম্ভব নয়। তাই আইনকে স্বাধীনতার পরিপন্থী না বলে পরিপূরক বলা যো পারে। অন্যভাবে বলা যায়, আইনই হল স্বাধীনতার শর্ত।
কিন্তু আইন প্রণীত হয় সরকারের দ্বারা এবং সরকার পঠিত হয় মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকে নিয়ে। তাই অনেক সময় দেখা যায় যে, সরকার যাঁদের নিয়ে গঠিত হয়, সেইসব ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থসিখির প্রয়োজনে আইনের অপব্যবহার ক'রে থাকেন। তাঁরা এ কথা ভুলে যান যে, জনকল্যাণসাধনই তাঁদের প্রাথমিক কর্তব্য। বলা বাহুল্য, আদর্শভ্রষ্ট সরকার নির্বাচিত হলেও ক্ষমতার আসনে বসে জনসাধারণের স্বাধীনতা রক্ষা করার পরিবর্তে তার বিনাশসাধন করে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থসিন্ধির কাজে আত্মনিয়োগ করে। ফলে রাষ্ট্রীয় আইন পক্ষপাতমূলক হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, শ্রেণিবৈষম্যমূলক সমাজে আইন উৎপাদনের উপকরণসমূহের মালিকদের স্বার্থেই পরিচালিত হয়। ওই শ্রেণি রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে ব্যবহার করতে সমর্থ হয় বলে রাষ্ট্রীয় আইন কখনোই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারে না। এরূপ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আইনের সাহায্যে সংখ্যালঘিষ্ঠ শাষকশ্রেণির অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে স্বাভাবিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। এইসব ক্ষেত্রে আইন কখনোই স্বাধীনতার শর্ত বলে বিবেচিত হতে পারে না। তাই রাক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য কতকগুলি বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এই কারণে প্রতিটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য কতকগুলি বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করাও হয়। এই ব্যবস্থাগুলিকে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ বলা হয়। অধ্যাপক ল্যাস্কি যথার্থই বলেছেন যে, সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া অধিকাংশ মানুষের পক্ষে স্বাধীনতা ভোগ করা অসম্ভব।
স্বাধীনতার যেসব গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচের ওপর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন, সেগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-*সামিমাণে মৌলিক অধিকার নিপিনন্দকরণ:
সংবিধানে মৌলিক অধিকারসমূহকে লিপিবদ্ধ করা এবং সেইসব অধিকারভঙ্গের বিরুদ্ধে শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের যথাযথ ব্যবস্থা করাকে অনেকে স্বাধীনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ বলে মনে করেন। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহকে সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হলে সেগুলি সম্পর্কে জনসাধারণের সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। এর ফলে অধিকারগুলি ভঙ্গ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারে। কোনো সরকার যদি এইসব অধিকার ভঙ্গ করে, তবে জনগণ সাংবিধানিক উপায়ে নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে সক্ষম। জনগণের স্বাধীনতার ওপর বিধিবহির্ভূতভাবে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ ক'রে গণতন্ত্রকে রক্ষা করাই হল নিরপেক্ষ আদালতের প্রধানতম কর্তব্য। এইসব কারণে সাম্প্রতিককালে সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলি লিপিবদ্ধকরণের বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গণসাধারণতন্ত্রী চীন, ফ্রান্স, জাপান, ভারত প্রভৃতি রাষ্ট্রের সংবিধানে মৌলিক অধিকার লিপিবন্ধ করা হয়েছে।
• সংবিধান স্বাধীনতার রক্ষাকর্তা নয়:
সংবিধানে মৌলিক অধিকারসমূহকে লিপিবদ্ধ করা হলেই যে ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষিত হবে, এমন কোনো কথা নেই। কারণ, ব্যক্তিস্বাধীনতার সংরক্ষক সংবিধান নয়। সচেতন জনগণই ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রকৃত রক্ষাকর্তা। তাই জনগণ যদি অজ্ঞ ও অশিক্ষিত হয়, তবে সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারসমূহকে ভঙ্গ করা হলেও তারা অধিকার রক্ষার সংগ্রামে অবর্তীর্ণ হতে পারে না। আবার, সংবিধান অলিখিত হলেও দেশের জনগণ সচেতন থাকলে তারা যে যথেষ্ট পরিমাণে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে, ব্রিটেনই হল তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তা ছাড়া, শ্রেণি-বৈষম্যমূলক সমাজের লিখিত সংবিধানে নাগরিকদের অর্থনৈতিক অধিকার প্রদান করা হয় না বলে তাদের অন্য সব অধিকার ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ:
সরকারের কার্যাবলি পরিচালিত হয় আইন বিভাগের মাধ্যমে। এগুলি হল-আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন করে, শাসন বিভাগ আইনকে বাস্তবে রূপ দেয় এবং বিচার বিভাগ আইনের ব্যাখ্যা করে। মতেস্কু, ব্ল্যাকস্টোন, ম্যাডিসন প্রমুখ ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির সমর্থকেরা মনে করেন যে, একই ব্যক্তি বা একই বিভাগের হাতে আইন-প্রণয়ন, শাসন ও বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষমতা অর্পণ করা হলে সমাজে কখনোই ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষিত হতে পারে না। কারণ, অত্যধিক ক্ষমতা ওই ব্যক্তি বা বিভাগকে ।


0 Comments