উত্তর :-  সাম্যের অধিকার (Right to Equality)

**সাম্যের অর্থ:

 সাম্য বলতে বোঝায় ধনী-নিখন, অভিজাত অভাজন, স্ত্রী-পুরুষ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ প্রস্তুতি নিবিশেষ প্রতিটি মানুষকে তার আত্মবিকাশের উপযোগী সমান সুযোগসুবিধা প্রদান। অধ্যাপক হ্যারল্ড স্যান্ধি (Harold Laska)-র মতে, সমাজের মধ্যে যদি বিশেষ সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা বর্তমান থাকে, তাহলে জনগণের কোনোরকম স্বাধীনতা থাকতে পারে না। তাই সাম্যের অধিকার আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে স্বীকৃতিলাভ করেছে। ভারতেও সাম্যের অধিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

**আহিদের দৃষ্টিতে সময়ার অধিকার:

ভারতীয় সংবিধানের ১৪ থেকে ১৮ নং ধারায় সাম্যের অধিকার ঘোষিত ও স্বীকৃত হয়েছে। ১৪ নং ধারায় বলা হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে রাষ্ট্র কোনো বান্ধিরে 'আইনের দৃষ্টিতে সমতা' ('equality before the law') কিংবা 'আইনসমূহ কর্তৃক সমভাবে রঞ্চিত' (equal protection of the laws) হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না। আইনের দৃষ্টিতে সমতা' কথাগুলি রিটেল্ডর সাধারণ আইন (common lawn) থেকে সংগৃহীত হয়েছে। ডাইসির 'আইনের অনুশাসন' ('rule of law') তত্ত্বের দ্বিতীয় নীতিটি হল আইনের দৃষ্টিতে সমতা। ১৯৬০ সালে বিচারপতি সুবা রাও 'আইনের দৃষ্টিতে সমতা'তে 'একটি নেতিবাচক ধারণা' (a negative concept') বলে চিহ্নিত করেছিলেন। কারণ, এই কথাটির অর্থ হল --

   কেউই বিশেষ কোনো সুযোগসুবিধা (special privilage) দাবি করতে পারে না এবং সব শ্রেণির নাগরিকই দেশের সাধারণ আইনের দ্বারা সমভাবে সংরক্ষিত হবে। ক্ষমতা, পদমর্যাদা ও অবস্থা নির্বিশেষে প্রতিটি বাছি সাধারণ আইনের অধীন এবং সাধারণ আদালতের কাছে একই রকম বেআইনি কাজের জন্য সকলকেই সমানভাগে দায়ী থাকতে হয়। এ বিষয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাধারণ একজন কৃষকের কোনো পার্থক্যা নেই। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে আইভর জেনিংস (Ivor Jennings) বলেছেন যে, আইনের দৃষ্টিতে সমস্তা বলতে বোঝায় "সমকক্ষদের মধ্যে আইন সমান ও সমভাবে প্রযোজ্য হবে" ('among equals the law should be equal and should be equally administered') এবং 'একই ধরনের কাজের জন্য' ('for the same kind of action') সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জাতি, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্বিশেষে আদালতে অভিযোগ করতে বা অভিযুক্ত হতে পারবে। বুবিন্দর সিং বনাম ভারত ইউনিয়ন (১৯৮৩) মামলায় সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত রায় অনুযায়ী, আইনের অনুশাসন এই দাবি করে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চাম প্রয়োজনীয়তার সময়েও কোনো ব্যক্তির সঙ্গে 'কঠোর, বর্বর কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণ' ('harsh, uncivilized or discreminatory treatment') করা চলবে না।

• কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম:-

ভারতে 'আইনের দৃষ্টিতে সমতা' নীতির কতকগুলি ব্যতিক্রম (exception) বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এগুলি হল।

 (১) রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালরা পদাধিকারবলে যেসব ক্ষমতা প্রয়োগ এবং কর্তব্য সম্পাদন করেন কিংবা তা করতে গিয়ে যেসব কার্য করেন, সেজন্য তাঁদের কোনো আদালতের কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না।

[২] রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালরা যতদিন স্বপদে বহাল থাকেন, ততদিন পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায় না।

(৩) স্বপদে বহাল থাকাকালীন এঁদের গ্রেফতার বা কারাবাদের জন্য কোনো আদালত নির্দেশ দিতে পারে না। 
(৪) এমনকি, স্বপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বা পরে সম্পাদিত ব্যক্তিগত কার্যাবলির জন্য রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালদের বিরুখে দেওয়ানি মামলা দায়ের করার জন্য ২ মাসের নোটিশ দিতে হয়।

উপরিউক্ত সাংবিধানিক ব্যতিক্রম ছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি ক্ষেত্রে 'আইনের দৃষ্টিতে সামা' নীতির ব্যতিক্রম দেখা যায়। সেগুলি হল।

(১) বিদেশি রাষ্ট্রের শাসকদের এবং রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের সলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায় না। কারণ, তাঁরা ভারতীয় আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত নন।


[ ২] যুদ্ধকালীন অবস্থায় শত্রুপক্ষের ব্যক্তিরা ভারতীয় আদালতে মামলা বুজু করতে এবং অন্যান্য বন্দিদের মতো সুযোগসুবিধাও দাবি করতে পারে না।
         ৩) পালামেন্ট এবং রাজা আইনসভার সদস্যরা বেশ কয়েকটি বিশেষাধিকার' ('privileges') ভোগ            করেন।
৪) এস এম সংবিধান সংশোধনী আইন (১৯৭৮) অনুযায়ী পার্লামেন্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক আদালত (Adminismative Tribunal) গঠন করতে পারে। যে-কোনো সরকারি কর্মচারী, স্থানীয় সন্ধো বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীবৃন্দের চাকুরি সংক্রান্ত যাবতীয় বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব ট্রাইবিইনালের হাতে অর্পণ করা হয়। তা ছাড়া, শিল্প, ভূমিসংস্কার, খাদ্য সংগ্রহ ও বন্টন প্রভৃতি সংক্রান্ত বিয়োব নিষ্পত্তির জন্যও সংশ্লিষ্ট আইনসভা আইনের মাধ্যমে উইিবিউনাল গঠন করতে পারে।

** অইপ কর্তৃক সমভাবে রন্ধিত হওয়ার অধিকার:-

     সংবিধানের ১৪ নং ধারার দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত আইন করল সমভাবে রক্ষিত হওয়া'র অধিকারটি মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১নং বারা না।) থেকে সংগৃহীত হয়েছে। ১৯৬০ সালে প্রদত্ত একটি মামলার রায়ে বিচারপতি সুব্বা রাও এই অধিকারটিকে 'একটি ইতিবাচক ধারণা' ('a positive concept') বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতে, আইন কর্তৃক অভাবে রক্ষিত হওয়া বলতে বোঝার-- সমান অবস্থায় সমপর্যায়ভুক্ত সব ব্যক্তির প্রতি আইন সমান আচরণ করবে। এবং সকলকে সমানভাবে রক্ষা করবে। ভারতীয় সংবিধান বিশারদ দুর্গাদাস বসুও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন।

 • কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম: 

       এর অর্থ এই নয় যে, অবস্থার বিচারবিশ্লেষণ না-ক'রে প্রতিটি আইন সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযুক্ত হবে। যুক্তিসংগতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে এবং প্রতিটি পৃথক ক্ষেত্রে আইন পৃথকভাবে প্রযুক্ত হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যাঁরাই আয় করেন, তাঁদের সবাইকে আয়কর প্রদান করতে হয় না। আয়ের পরিমাণের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন হারে আয়কর প্রদান করতে হয়। তবে এই শ্রেণিবিভাজনের ভিত্তি যথার্থ ও সুস্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং যে-উদ্দেশ্যে আইন প্রণীত হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার যুক্তিসংগত সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। সুতরাং যুক্তিসংগতভাবে আইনসভা বিভিন্ন ব্যক্তির শ্রেণিবিভাজন ক'রে আইন প্রণয়ন করলেও তা 'আইন কর্তৃক সমভাবে সংরক্ষিত হওয়ার' অধিকারকে খর্ব করে না। 
     বোম্বাই রাজ্য বনাম এক. এন. বালসারা (১৯৫১) মামলার রায়ে বিচারপতি ফজল আলি মন্তব্য করেছিলেন যে, এই নীতিটি রাষ্ট্রের হাত থেকে 'যুক্তিসংগত উদ্দেশ্যে ব্যক্তিবর্গের মধ্যে শ্রেণিবিভাজনের ক্ষমতা' ('the power of classifying persons for legitimate purpose') কেড়ে নেয়নি। অনুরূপভাবে, রামকৃষ্ণ ডালমিয়া বনাম তেন্ডুলকর (১৯৫৯) মামলার রায়ে বিচারপতি গজেন্দ্রগাদকার বলেছিলেন যে, ১৪ নং ধারা 'শ্রেণিগত আইন প্রণয়ন' (class legislation') নিষিদ্ধ করলেও 'যুক্তিসংগত শ্রেণিবিভাজনের জন্য আইন প্রণয়ন' নিষিদ্ধ করেনি। 'শ্রেণিগত আইন প্রণয়ন' বলতে সমাজের বহুসংখ্যক মানুষের মধ্যে 'এক শ্রেণির মানুষ' (class of persons")-কে খেয়ালখুশিমতো বেছে নিয়ে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলকভাবে বিশেষ কতকগুলি সুযোগসুবিধা তাদের প্রদানের জন্য আইন প্রণয়ন করাকে বোঝায়। সুতরাং বলা যেতে পারে যে, কোনো আইন যদি সমপর্যায়ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বৈষম্যমূলক আচরণ করে, সেক্ষেত্রে আদালত সেই আইন বাতিল ক'রে দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বনাম আনোয়ার আলি সরকার মামলায় সুপ্রিমকোর্টের রায়ের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এরূপ শ্রেণিবিভাজনের দুটি পূর্বশর্ত রয়েছে বলে বিচারপতি এস, আর, দাশ মন্তব্য করেছিলেন। সেগুলি হল-
         [১] শ্রেণিবিভাজনের নীতি সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য হবে এবং (২) শ্রেণিবিভাজনের সঙ্গে আইনের উদ্দেশ্যের যুক্তিসংগত সম্পর্ক বর্তমান থাকবে। সুতরাং বলা যায়, 'আইন কর্তৃক সমভাবে রক্ষিত' হওয়া বলতে কেবল বৈষম্যমূলক আইনের হাত থেকে সারক্ষণ করাকেই বোঝায় না, 'আইনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগের হাত থেকেও সংরক্ষণকে বোঝায়। কোনো আইন কিংবা তার প্রয়োগ বৈষম্যমূলক কি না, তা বিচার করার দায়িত্ব আদালতের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এইভাবে সংবিধানের ১৪নং ধারাটি ভারতে বিচারালয়ের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট সাহায্য করেছে বলে কে ছি. রাও প্রমুখ অভিমত ব্যক্ত করেন।

সাম্যের অধিকারের অবাস্তবতা:

 কিন্তু সাম্যের অধিকার তত্ত্বগতভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা ভারতীয় আমাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। কারণ, বনী ব্যজিদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে যাথোচিত কারলারে করো মীনা দরিদ্র জনসাধারণকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু মামলা চালাবার মতো ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা ঘরে নেই। ফলে ধনশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় অনেক সময় নির্দোষ দরিদ্র ব্যক্তিকে পরাজিত হতে হয়।