'সুভা' গল্পের নামকরণের সার্থকরা বিচার করো।

উঃ- লেখক-সাহিত্যিকরা তাঁদের সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে নামকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দান করেছেন। তাই নামকরণ হয় বিভিন্ন প্রকরণের ওপর ভিত্তি করে। কখনও তা হয় চরিত্রকেন্দ্রিক, কখনও ঘটনাকেন্দ্রিক, কখনওবা বাঞ্জনাধর্মী বা উপমাবাচক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আলোচ্য গল্পটির নাম রেখেছেন 'সুভা' যা গল্পের মূল চরিত্রকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে। চন্ডীপুরের অধিবাসী বাণীকণ্ঠ, তাঁর তিন কন্যার মধ্যে ছোটোটির আদর করে নাম রাখেন সুভাষিণী। অন্য সকলের মতো মেয়েটি বেড়ে ওঠে আর ধীরে ধীরে জানান দেয় যে, সে সব ব্যোকে, সবই পারে। তবে সে কথা বলতে পারে না। মায়ের লাঞ্ছনা তার নিত্য সঙ্গী। অবহেলা তার অমূল্য প্রাপ্তি। তবুও সে প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির আদরে ভুলে থাকে সংসারের সমস্ত বেদনা। নদীর কলতাল, পাখির ডাক, পাতার মর্মরতা বন্ধুর মতো তাকে আনন্দ দেয়।

     সে নির্বাক, তাই সবাকের মধ্যে তার আনাগোনা কম। গোয়ালের দুটি তার মনের যন্ত্রণাকে লাঘব করে গোরু দুটি। আর বিড়াল শাবকটি দ্বিধাহীন ভাবে তার কোলের উন্নতার ভাগীদার হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা মেয়েটির মন পরিবর্তিত হয় জীবনের নিয়ম মেনে। স্বপ্নালু চোখে সে নির্মল জোছনাকে গায়ে মাখে। প্রকৃতির বাকহীন আদরকে সে অনুভব করে। এভাবে বেশ চলছিল, কিছু বাণীকণ্ঠ একদিন কলকাতায় নিয়ে যায় তাকে, এক পাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং পাত্র মেয়েকে দেখতে আসে। সুভাষিণী বাকহীন হলেও চোখের জলের মাধ্যমে অনেক কথা বলে কিন্তু সে কথা কেউ বুঝতে না পারায় তার বিবাহ হয় এবং অল্পকালের মুধ্যেই পাত্রপক্ষ জানতে পারে যে, সুভাষিণী কথা বলতে পারে। না।

রবীন্দ্রনাথ আলোচ্য গল্পে 'সুভা' নামের বোবা মেয়েটির মূল বেদনাকে শিল্পীর কৌশলে লুকিয়ে রেখেছেন। ভাষাহীন মেয়ের এমন নাম আর এই নির্বাক মেয়েটির ক্রমপরিণতি পাঠককে এক নিদারুণ বেদনার মধ্যে নিয়ে যায়। সুভার ভাষাহীনতাই গল্পের আগাগোড়া প্রাণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই এই নামকরণটি সার্থক ও যথার্থ।

প্রশ্নঃ- 'সুভা' গল্পে 'সুভার' চরিত্র বিশ্লেষণ করো।

উঃ- 'সুভা' গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর লেখা, সুভা ছিল একজন বোবা মেয়ে, এই মেয়েটির প্রতি লেখকের হৃদয় বিদারক সমবেদনা ও মমতা গল্পটিকে অমর করেছে।

প্রকৃতির সঙ্গে এক অকৃত্রিম নিবিড়তা সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন শিল্প বৈচিত্র্য। বাণীকন্ঠের কণিষ্ঠা বোবা কন্যা সুভাষিণীকে আশ্রয় করে রবীন্দ্রনাথ এক বিমূর্ত যন্ত্রণার অব্যক্ত অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করেছেন এই গল্পে। গল্পে দেখা গিয়েছে, পিতা তার অন্য দুটি মেয়ে সুকেশিনী ও সুহাসিনীর সঙ্গে নামের মিল রেখে ছোটো মেয়েটির নাম রাখে সুভাষিণী। কিন্তু সে বোবা। তাই, অন্য দুটি মেয়ের বিবাহ হলেও সুভার জন্য পাত্র পাওয়া যায় না। কথা না বললেও সে যে অনুভব করতে পারে, তা তার পরিবারের মানুষদের মনে হয় না। সেইজন্য তারা সুভার সামনেই তার ভবিষ্যৎ সম্বন্দ্বে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করত। মাতা তার প্রতি বিরাগভাজন হলেও পিতা তাকে খুব ভালোবাসতেন। সুভা কথা না বললেও তার গভীর সুদীর্ঘ পল্লবিশিষ্ট কালো চোখ ও ওষ্ঠাধর তার শরীরের ভাব ও ভাষা হয়ে ফুটে উঠত। সাধারণ বালক-বালিকারা তাকে ভয় করত, তাই সে শব্দহীন ও সঙ্গীহীন। স্বাভাবিক মানুষের সাথে সুভার বন্ধুত্ব না হলেও প্রকৃতি কিন্তু তার দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, আমরা দেখতে পাই ছাগল, গরু, বেড়াল ছানা ছিল সুভার বন্ধু, প্রকৃতির সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক ছিল তার, নদীর কল কল শব্দ, পাখির কলরব সুভার মূক জীবনের শব্দের অভাব দূর করেছিল।

এখানে নদীর কলতান, মাঝিরগান, পাখির ডাক, তবুর মর্মর যেন এই বোবা মেয়েটির হয়ে কথা বলে। সর্বশী ও পাঙ্গলি নামক গোয়ালের দুটি গাভি ছিল সুভার অন্তরঙ্গ বন্ধু।

প্রশ্নঃ-   সুভার সঙ্গে মনুষ্যত্বের প্রাণীর বন্ধুত্ব কেমন ছিল লেখো।

উঃ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুভা আজন্ম বোবা, কথা বলতে অক্ষম। আলোচ্য গল্পে দেখা যায়, সুভার সঙ্গে তাদের গোয়ালের দুটি গাভি সর্বশী ও পাঙ্গুলির একটি বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সুভার পায়ের শব্দ এই মনুষ্যত্বের প্রাণীদুটির অত্যন্ত পরিচিত। সুভার অন্তর্বেদনা তারা ভাষার থেকে ভালো বুঝত। সুভা কখন তাদের আদর করছে, ভর্ৎসনা করছে, তা তারা মানুষের চেয়ে বেশি বুঝত। সে দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার গোয়ালঘরে যেত, এ ছাড়া। তার অনিয়মিত যাতায়াতও ছিল।

         সুভা গোয়ালে ঢুকে দুই বাহু দিয়ে সর্বশীর গলা জড়িয়ে ধরলে নিজের গাল তার কানের কাছে ঘষত এবং পাঙ্গুগুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তার প্রতি নিরীক্ষণ করে তার গা চাটত। সুভা যেদিন বাড়িতে কঠিন কথা শুনত, সেদিন অসময়ে তার এই মূক বন্ধু দুটির কাছে আসত। সুভার সহিষুতা পরিপূর্ণ শান্ত দৃষ্টিপাত থেকে তারা এই বালিকার মর্মবেদনা উপলব্ধি করে তার বাহুতে শিং ঘষে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত। কলকাতা যাওয়ার পূর্ব দিনে সে তার এই দুটি বাল্যসখীদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিল।

এরা ছাড়াও ছাগল এবং বিড়াল শাবকের সঙ্গেও সুভার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তারা সুভার প্রতি যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করত। বিড়াল শিশুটি দিন ও রাত্রে যখন তখন সুভার গরম কোলে এসে ঘুমোত এবং সুভা তার ঘাড় ও পিঠ নরম আঙ্গুল বুলিয়ে তার সুখনিদ্রায় সাহায্য করত।