উঃ- মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হয়েছিল, তখন কে জানত সে বোবা হবে। তার দুটি বোনকে সুকেশিনী ও সুহাসিনী নাম দেওয়া হয়েছিল, তাই মিলের অনুরোধে তার বাবা ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে। এখন সকলে তাকে সংক্ষেপে সুভা বলে। দস্তুরমত অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হয়ে গেছে, এখন ছোটোটি পিতামাতার নীরব হৃদয়ভারের মতে বিরাজ করছে। যে কথা কয় না, সে যে অনুভব করে এটা সকলের মনে হয় না, এইজন্য তার সামনেই সকলে তার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করত। সে যে বিধাতার অভিশাপস্বরূপে তার পিতৃগৃহে জন্মগ্রহণ করেছে এ কথা সে শিশুকাল থেকে বুঝেছে। তার ফলস্বরূপ সাধারণের দৃষ্টিপথে সে নিজেকে গোপন করে রাখতে সর্বদাই চেষ্টা করত, মনে করত, আমাকে সবাই ভুললে বাঁচি। কিন্তু, বেদনা কি কেও কখনো ভোলে। পিতামাতার মনে সে সর্বদাই জাগরুক ছিল।

         বিশেষত, তাহার মা তাকে নিজের একটা ত্রুটিস্বরূপ দেখেছেন কেননা, মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরূপে দেখেন, কন্যার কোনো অসম্পূর্ণতা দেখলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলে মনে করেন। বরং তার বাবা সুভাকে তাঁর অন্যান্য মেয়েদের অপেক্ষা যেন একটু বেশি ভালোবাসতেন কিন্তু নিজের গর্ভের কলঙ্ক ভেবে তার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন। সুভার কথা ছিল না, কিন্তু তার সুদীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ ছিল- এবং তার ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্রে কচি কিশলয়ের মতো কেঁপে উঠত।

     গৃহস্থঘরের গ্রামের নাম চন্ডীপুর। নদীটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদী, ও মতো বহুদূর পর্যন্ত তার প্রসার: নিরলসা তন্বী নদীটি আপন কুল রক্ষা করে কাজ কর যায়। দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তার যেন একটা-না-একটা সম্পর্ক আছে দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উচ্চ তট নিম্নতল দিয়ে গ্রামলক্ষী স্রোতক্ষি আত্মবিস্মৃত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল হৃদয়ে অসংখ্য কল্যাণকার্যে চলেছে। বাণীকন্ঠের । নদীর একেবারে উপরেই। তার বাঁখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশাল খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা, আম কাঁঠাল এবং কলার বাগান নৌকাবাহি মাত্রেরই দূরি আকর্ষণ করে। মেয়েটির

     এই গার্হস্থ্য সচ্ছলতার মধ্যে বোবা মেয়েটি কারও নজরে পড়ে কি না জানি না, কিন্তু কাজকর্মে যখনি অবসর পায় তখনি সে এই নদীতীরে এসে বসে। প্রকৃতি যেন তার ভাষার অভাব পূরণ করে দেয়। যেন তার হয়ে কথা বলে। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর-সমন্ব মিশে এক হয়ে সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়-উপকূলের কাছে এসে আছড়ে আছড়ে পড়ে।

        সুভার যে গুটিকতক অন্তরজা বন্ধুর দল ছিল না তা নয়। গোয়ালের দুটি গাভী, তাহাদের নাম সর্বশী ও পাঙ্গুলি। সে নাম বালিকার মুখে তারা কখনো শুনেনি, কিন্তু তার পায়ের শব্দ তারা চিনত তার কথাহীন একটা করুণ সুর ছিল, তার মর্ম তারা ভাষার অপেক্ষা সহজে বুঝতো। সুভা কখন তাদের আদর করে কখন ভর্ৎসনা করে, কখন মিনতি করে, তা তারা মানুষের অপেক্ষা ভালো বুঝতে পারত। সুভা গোয়ালে ঢুকে দুই বাহুর দ্বারা সর্বশরীর গ্রীবা বেষ্টন করে তার কানের কাছে নিজের গন্ডদেশ ঘর্ষণ করত এবং পাঙ্গুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তার প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তার গা চাটত।

   বালিকা দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার করিয়া গোয়ালঘরে যেত, তাছাড়া অনিয়মিত আগমনও ছিল, গৃহে যেদিন কোনো কঠিন কথা শুনত সেদিন সে অসময়ে তার এই মূক বন্ধু দুটির কাছে আসত। তার সহিষুতা পরিপূর্ণ বিষাদশাস্ত দৃষ্টিপাত থেকে তারা কী একটা অন্ধ অনুমানশক্তির দ্বারা বালিকার মর্মবেদনা যেন বুঝতে পারত এবং সুভার গা ঘেঁষে থাকত। অল্প অল্প তার বাহুতে শিং ঘষে ঘষে তাকে নির্বাক ব্যাকুলতার সাথে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করত।

    তাছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও ছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গেঙ্গ সুভার এরকম সম্যকভাবে মৈত্রী ছিল না, তথাপি তারা যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করত।বিড়ালশিশুটি দিনে এবং রাত্রে যখন-তখন সুভার গরম কোলটি নিঃসংকোচে ভাধিকার করত। সুখনিদ্রার আয়োজন করত এবং সুভা তার গ্রীবা ও পৃষ্ঠে কোমল অঙ্গুলি বুলিয়ে দিলে যে তার নিদ্রাকর্ষণের বিশেষ সহায়তা হয়, ইঙ্গিতে এরুপ অভিপ্রায়ও প্রকাশ করত।

       গোঁসাইয়ের ছোটো ছেলে প্রতাপ নিতান্ত অকর্মণ্য। তার দ্বারা গৃহের উন্নতি হবে সে আশা তার পিতামাতা ত্যাগ করেছেন। প্রতাপের শখ হলো মাছ ধরা। সে যে কোনো। কাজেই একজন সঙ্গী পছন্দ করত। মাছ ধরার সময় নির্বাক সঙ্গীইি ভালো। তাই সে সুভাকে মর্যাদা দিত। তাকে আদর করে 'সু' বলত। সুভা তেতুলতলায় বসে তাকলেও কোনো অভূতপূর্ব কাজের মাধ্যমে প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইত, কিন্তু পারত না।
          ক্রমে সুভা যৌবনপ্রাপ্ত হলো। কন্যাভারগ্রস্ত পিতামাতা সমাজে নিজেদের অবস্থান যথাযথ রাখতে কিছুদিনের জন্য কলকাতায় খেল। সেখানে সুভাকে পাত্র দেখতে এল। পাত্র সুভার বাকশক্তিহীনতার কথা না জেনেই তাকে পছন্দ করল। পঞ্জিকামতে শুভলগ্নে তাদের বিবাহ হলো। পিতা মাতা বোবা মেয়েকে অন্যের হাতে দিয়ে কন্যাদায় থেকে ভারমুক্ত হয়ে দেশে ফিরে গেল। কিন্তু, কিছুদিন পরেই সুভার বর তার এই অক্ষমতার কথা জেনে দ্বিতীয়বার এক ভাষাবিশিষ্ট কন্যা বিয়ে করে আনল।