'ছুটি' ছোটো গল্পের সারমর্ম টি উপস্থাপন করো।
জয় গল্পটির মূল চরিত্র হলো তেরো-চৌদ্দ বছরের এক উদ্দাম কিশোর ফটিক চক্রবর্তী। গ্রামের বালকদের নিকট ফটিক সর্দার স্বরূপ। ছিপ, ঘুড়ি, লাটাই নিয়ে গ্রামের পথে ঘাটে 'তাইরে নাইরে নাইরে না' করে ঘুড়ে বেড়ানো, পড়ায় ফাঁকি দেয়া ইত্যাদি কাজেই সে সারাদিন ব্যস্ত থাকতো, যা একজন তেরো-চৌদ্দ বছরের কিশোর বালকের সাধারণ স্বভাবের মাঝেই পড়ে বলা যায়।
ফটিকের ছোটো ভাই মাখন। গল্পের শুরুতেই আমারা দুই ভাইয়ের মাঝে এক প্রকার দ্বন্দু দেখতে পাই। ফটিক অন্যান্য বালকদের শালকাঠের গুঁড়ি গড়িয়ে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দেয়। অন্যান্য বালকরা প্রস্তাবে সায় দিলেও বাধ সাধে ফটিকের ছোটোভাই মাখনলাল ফটিকের নিষেধ শোনার পরেও সে খেলায় বিঘ্ন ঘটাতে অকাল গাম্ভীর্য নিয়ে শালকাঠের উপরে বসে থাকে। অবশ্য সে এর ফলও ভোগ করে যখন ফটিক ও তার বন্ধুরা মাখনকে সহই শালকাঠের গুঁড়ি গড়াতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে মাখন ঝাঁপিয়ে পড়ে ফটিকের উপর। এখানে মজার ব্যাপার হলো মাখন ফটিককে মারতে উদ্যত হলেও ফটিক কিন্তু তার ভাইয়ের উপর হাত তোলে না।
তবে বাড়ি ফেরার পর মায়ের হাতে ফটিকেই শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। কেননা তার মা মাখনের বলা মিথ্যে কথাকেই বিশ্বাস করেছেন। পারিবারিক এই দ্বন্দের মুহূর্তে আগমন হয় এক আগন্তুকের। আগন্তুক হলেন ফটিকের মায়ের দাদা বিশ্বস্তরবাবুর। তিনি অনেকদিন আগে পশ্চিমে কাজ করতে গিয়েছিলেন। এর মাঝে 'ফটিকের মার দুই সন্তান হইয়াছে, তাহারা অনেকটা বাড়িয়া উঠিয়াছে,
তাহার স্বামীর মৃত্যু হইয়াছে, কিন্তু একবারও দাদার সাক্ষাত পায় নাই।' দাদা ছেলেদের কথা জিজ্ঞেস করলে, উত্তরে ফটিকের অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খলভ পাঠে অমনোযোগ, এবং মাখনের সুশান্ত সুশীলতা ও বিদ্যানুরাগের কথা ব্যাখ্য করলেন অথচ ফটিককে অবাধ্য ভাবার কোনো আবশ্যিক কারণ নেই তার। ফাটির তাই করে যা যেকোনো চৌদ্দ বছরের বালকের পক্ষে করাটাই স্বাভাবিক। কিছু ফটিকের মা তা মানতে নারাজ। হয়তো এইজন্যই বিশ্বম্ভরবাবু ফটিককে কলকাত নিয়ে গিয়ে শিক্ষা দিতে চাইলে, ফটিকের মা রাজি হয়ে যান সানন্দে।
কলকাতা গিয়ে ফটিকের প্রথম পরিচয় হয় তার মামির সাথে। সংসারে একজন বাড়তি মানুষ যোগে তিনি যে খুশি নয় তা বলাই বাহুল্য। তাই স্বাভাবিক ভাবেই ফটিক ছিল তার মামীর স্নেহবঞ্চিত। অথচ সে সময়টাতেই ফটিকের একটু স্নেহ, একটু মায়া, একটু মমতার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। সর্বাত্মক চেষ্টার পরেও সে যখন মামীর চোখে নিজের জন্য সামান্য একটুও মমতা দেখতে ব্যর্থ হতো
'তখন তাহার মানসিক উন্নতির প্রতি মামীর এতটা যত্নবাহুল্য তাহার অত্যন্ত নিষ্ঠুর অবিচার বলিয়া মনে হইত।'
তবে মামী থেকে অবহেলা পেলেও ফটিক তার মামার স্নেহ হতে বঞ্চিত ছিলনা। তাকে কলকাতায় এনে ভালো একটি জীবন দেয়ার চেষ্টা, কার্তিক মাসের পুজোর ছুটিতে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস এসব তার স্নেহেরই বহিঃপ্রকাশ তবে বিশ্বস্তরের স্নেহেও শেষ পর্যন্ত ফটিকের শেষ রক্ষাটা আর হয়নি।
কলকাতায় ফটিকের স্কুলের জীবনটাও খুব সুখের ছিল না। সে অমনোযোগী ছাত্র, তাই মাস্টারমশাইরা ওকে না মেরে পারতেন না। স্কুলের বাকি ছাত্রদের কাছে ফটিক ছিল এক অপমানের বস্তু। স্কুলের এমন অপমান ও বাড়ির অবহেলা থেকে দূরে যাওয়া, এবং বাড়ি ফেরার এক তীব্র আকাত্তক্ষা সব পরিণতি পায় যখন তীব্র জ্বর মাথায় নিয়ে কাউকে কিছু না বলেই ফটিক হেঁটেই কলকাতা থেকে গ্রামে ফিরে যেতে চেষ্টা করে।
গল্পটি শেষ হয় ফটিকের এক করুণ পরিণতি দিয়ে। মাকে বলা ফটিকের স্মরণীয় একটি লাইন 'মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি'।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট এই গল্পটি আমাদের বয়ঃসন্ধিকালের একজন বালকের জন্য স্নেহ-মমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে দিয়ে যায়। বয়ঃসন্ধিকাল সময়টা খুবই অদ্ভূত। বড় হয়ে যাওয়া ও ছোটো রয়ে যাওয়ার মাঝামাঝি এই সময়টার উপর নির্ভর করে একজন বালকের জীবন ভাঙ্গবে নাকি গড়বে। এই সময়টুকুতে সঠিক পথপ্রদর্শন ও পরিমিত স্নেহমমতা না পেলে তা একজন বালকের জীবনে কতটুকু ভয়ংকর হতে পারে, তা 'ছুটি' গল্পের ফটিকের পরিণতি পরে কিছুটা আন্দাজ করা যায় বৈকি।


0 Comments