ছোটগল্প - শাস্তি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
'শান্তি' কাহিনী সংক্ষেপ আলোচনা করো।
'শান্তি' গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিনটি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত করেছেন, প্রথম পরিচ্ছেদে রয়েছে, কুরি পরিবারে বসবাসকারী দুই কোর্ফা প্রজা হলো ছিদাম বুই ও দুখিরাম বুই। গল্পটির শুরু দুখিরাম বুই ও ছিদাম রুই দুই ভাই দাঁহাতে জন খাটতে চলে যাওয়ার পরই তাদের দুই স্ত্রী রাধা ও চন্দরা ঝগরায় লিপ্ত হত। তাদের এই কলহ পাড়াসুদ্ধ সকলের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের স্বামীদের হৃদয়কে এই কলহ স্পর্শ করত এবং তারা এক অনৈসর্গিক উপদ্রবের আশঙ্কার কথা মনে করতো।
গরমের কাল হওয়ায় অত্যন্ত গুমোট, দ্বিপ্রহরে অবশ্য একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, ফলে ব্যাঙ ডাকছে। বর্ষায় পদ্মার পাড় ভেঙে লোকালয়ের কাছাকাছি এসে গেছে। এরূপ একটি দিন দুখিরাম ও ছিদাম জমিদারের কাছারি ঘরে কাজ করতে গিয়েছিল। সারাদিন সেখানেই তাদের কাটাতে হয়েছে, সামান্য জলপান করেছে, উচিৎ মত পাওনা মজুরি পর্যন্ত পায়নি। উপরন্তু অন্যায় কটু কথা শুনতে হয়েছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দুখিরাম স্ত্রী রাধার কাছে 'ভাত' চাইলে সে আগুনের মতো জ্বলে উঠে এবং স্বামীকে কটু কথা শোনায়, ক্ষুধার্ত দুখিরাম মুহূর্তে মানসিক 'ভারসাম্য হারিয়ে স্ত্রীর মাথায় 'দা' এর কোপ বসিয়ে দেয় এবং সাথে সাথেই রাধার মৃত্যু হয়। দুখিরাম হত বুদ্ধির মতো ভূমিতে বসে পড়ে।
বাইরে তখন পরিপূর্ণ শান্তি বিরাজ করলেও দুখিরামের বাড়ীতে বিপদ দেখা যায়। এমতো সময় চক্রবর্তীদের বাড়ির রামলোচন খুড়ো খাজনা নেওয়ার জন্য দুখিরামের বাড়িতে আসে এবং সমস্ত ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। ছিদাম তাঁর দাদাকে বাঁচাতে খুনের দায় চন্দরার ওপর চাপিয়ে দেয়। অবশ্য সে আশা করেছিল
কৌশলে চন্দরাকে বাঁচিয়ে নেবে। মামলা-মোকদ্দমার পরামর্শে রামলোচন সমস্ত গ্রামের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। চন্দরাকে বাঁচানোর উপায় হিসেবে রামলোচন ছিদামকে পরামর্শ দেয় দুখিরামের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে কিন্তু ছিদাম তা চায় না, কারণ তার মতে, 'বউ গেলে বউ পাওয়া যাবে, কিন্তু দাদার ফাঁসি হয়ে গেলে দাদা পাওয়া যাবে না'। চক্রবর্তীও কথাটা যুক্তিসঙ্গত মনে করে সেখানে থেকে প্রস্থান করে, এরপর গ্রামে পুলিশ আসে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দেখতে পাই, ছিদাম সিদ্ধান্তে অটুট থাকে এবং স্ত্রী চন্দরাকে অপরাধ নিজ কাঁধে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। চন্দরা স্বামীর ব্যবহারে হতবাক হয়ে যায়, তার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। চন্দরার বয়স সতেরো-আঠারো হবে। হৃষ্টপুষ্ট, কবির ভাষায় 'নুতন তৈরী নৌকার মতো'। কৌতুক ও কৌতূহল প্রিয়। বড় বউ রাধা কিন্তু তার বিপরীত চরিত্র। অত্যন্ত এলোমেলো ঢিলা ঢালা, অগোছালো। দুখিরাম নিরীহ প্রকৃতির অথচ সবল অথচ নিরূপায় মানুষ অতি দুর্লভ। ছিদামকে যেন কেউ চকচকে কালো পাথরে বহু যত্নে কুঁদিয়া গড়ে তুলেছে। ছিদাম ও চন্দরা একে অপরকে সন্দেহের নজরে দেখলেও ভালোবাসা ছিলো গভীর। ছিদাম স্ত্রী চন্দরাকে খুন স্বীকার করে নিতে বললে সে স্তম্ভিত হয়ে যায় এবং তার অন্তরাত্মা স্বামী রাক্ষসের দিক থেকে বিমূখ হয়ে যায়।
তৃতীয় পরিচ্ছেদে রয়েছে, ছিদাম স্ত্রীকে নানা কথা শেখাতে থাকে। পুলিশ তদন্ত শুরু করে। চন্দরাই যে বড়োজা কে খুন করেছে গ্রামের সকলে বিশ্বাস করে। পুলিশের কাছে চন্দরা আপন অপরাধ স্বীকার করে এবং বলে, বিনা দোষেই রাধাকে সে খুন করেছে, কারণ সে তাকে দেখাতে পারত না। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও চন্দরা দোষ স্বীকার করে। ছিদাম সাক্ষ্যমহলে এসে চন্দরা নিরপরাধ সে কথা বললেও কেউ বিশ্বাস করে না। চন্দরাকে সেশনে চালান দেওয়া হয়। আসল খুনি দুখিরাম সাক্ষাদানেও দোষ স্বীকার করলেও জর্জ সাহেব তা বিশ্বাস করেন না। অবশেষে চন্দরার ফাঁসির আদেশ হয়। সিভিল সার্জন চন্দরাকে জিজ্ঞাসা করেন, "কাহাকেও দেখিতে ইচ্ছা হয়"। চন্দরা নিজের মা-কে শেষ দেখা দেখতে চায় এবং স্বামীর প্রসঙ্গ উঠলে চন্দরার শেষ উক্তি, "মরণ"।


0 Comments